মেনু নির্বাচন করুন

হিমছড়ি ঝর্ণা ও মারমেইড ক্যাফ

হিমছড়ি :

হিমছড়ির ১৮ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজার সমুদ্র তীরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত পিকনিক ও শ্যুটিং এর জন্য একটা সুন্দর জায়গা। এখানকার পাহাড়ি ঢিলা ও ঝর্ণা বিরল ও বিখ্যাত। বামে সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রির্সোট থেকে সমুদ্রের সৌর্ন্দয্য উপভোগ করা যায়। হিমছড়ির বামে সবুজ পাহাড় ও ডানে সমুদ্র তরঙ্গ উপভোগ করার মতো।

মারমেইড ক্যাফ :

কক্সবাজার এয়ারপোর্ট থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে রেযুখাল নদী। সেই নদীর তীরে জেলেদের এক ছোট্ট গ্রাম প্যাঁচার দ্বীপ। সে গ্রামের প্রায় সবাই মাছ শিকার করে জীবন চালায়। মাছ শিকারের প্রয়োজনে কখনও নদী থেকে সমুদ্র পাড়ি দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অথবা জোয়ারের উত্তাল সমুদ্র ঢেউয়ে তাদের অনেকেই হারিয়েছে প্রাণ। দরিদ্র গ্রামবাসীদের পিছু ছাড়ে না ক্ষুধা ও অভাব। নেই ভাত-কাপড়ের জোগান। জীর্ণশীর্ণ নোংড়া স্যাঁতসেঁতে ঘরে গাদাগাদি করে কোনো একরকম বসবাস করে সবাই। একই রকম তাদের সকলের ভাগ্যচক্র। এ যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসের কেতুপুর গ্রামের বাস্তব সংস্করণ।

প্যাঁচার দ্বীপ গ্রামটি কলাতলী থেকে খুব বেশি দূরে নয়। গ্রামের কেউ কেউ আবার জীবন চালায় পান-সুপারি চাষ করে। তবে সেখানেও আছে কতিপয় দুষ্টচক্র, যারা অবৈধভাবে চিংড়ি চাষ বা বৃক্ষনিধনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এত প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও এক স্বপ্নের সন্ধান পেয়েছে সেখানকার অভাবী মানুষজন। যেখানে একবেলা ভাত খাওয়ার সুযোগ পেত না তারা, সেখানে খেয়ে-পড়ে বাঁচতে পারছে এখন। মাটি বা গাছপালা কেটে যে অনাহারী জীবন তারা পার করেছে, তা আজ আর অনেকাংশে নেই। মেলেছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এখন তাদের মাসিক আয় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।আর এর সবকিছু সম্ভব হয়েছে একজন সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের নেতৃত্বে। তাঁর নাম এলিয়েন সোহাগ। একজন প্রাণবন্ত যুবক। তাঁরই হাত ধরে পাল্টে গেছে সেখানকার মানুষদের ভাগ্যের চাকা। মারমেইড ইকো রিসোর্ট নামের মনোমুগ্ধকর এক ভ্রমণ স্থান তিনি সেখানে গড়ে তুলেছেন । কক্সবাজার এয়ারপোর্ট থেকে অটো রিক্সায় মাত্র ২০ মিনিটেই পৌঁছানো যায় সেখানে। সেই জায়গায় কাজ জোটে প্যাঁচার দ্বীপ গ্রামের দরিদ্র-বেকার মানুষের। বদলে যায় তাদের গতানুগতিক জীবনযাপন।এবার আসা যাক মারমেইড ইকো রিসোর্ট সম্পর্কে। নান্দনিক এ মারমেইড রিসোর্টটি ইকো-ট্যুরিজমের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। মূলত ইকো ট্যুরিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকৃতির কোনোরূপ সম্পদের বিনষ্ট না করে পরিবেশবান্ধবভাবে উপভোগ্য কোনো জায়গা তৈরি করা। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই মারমেইড ইকো রিসোর্টটি যে নির্মাণ করা হয়েছে তা একবার ঘুরে এলেই অনুধাবন করা যায়।

পুরো রিসোর্ট ভাবনা নিয়ে খোলামেলা কথা হয় এর প্রতিষ্ঠাতা এলিয়েন সোহাগের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমার এ রিসোর্টটি তৈরি করার সময় পরিবেশের ভারসাম্যের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখা হয়েছিল। নির্মাণ কাজে যেন কোনো গাছ কাটা না পড়ে সে ব্যাপারে আমি খুব সতর্ক ছিলাম। কারণ এ বিস্তৃর্ণ সবুজের নিবিড় পরশে আমি আমার মারমেইড ইকো রিসোর্টটিকে রাখতে চেয়েছি। তাই রোপণ করেছি আরো ৩০০০ চারাগাছ। সেসব চারা এখন বেড়ে বড় বড় গাছে পরিণত হয়েছে। তারই অপূরক সৌন্দর্যের মাঝে একাত্ম করে সেটিকে গড়ে তুলেছি। এমনকি রিসোর্টের থাকার ঘরগুলোর ছাদ-চালা বাঁশ ও ছন দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন তা কোনোভাবেই গাছপালাগুলোর উচ্চতাকে ছাড়িয়ে না যায়। আশপাশের নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব জায়গায় মাটি এবং কাঠ রঙের ব্যবহার করেছি। অযত্নে বেড়ে ওঠা বুনো লতাগুল্মগুলোও আমার ভালোবাসার ধন। সেগুলো যেন তাদের স্বাভাবিক নিয়মে বেড়ে উঠতে পারে তা নিয়েও ভেবেছি অনেক। রিসোর্টটিকে তাই সবসময় বুনো ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখি।বাংলোর জানালা ও দরজারগুলো বড় বড় রেখেছি যেন আগত অতিথিরা সুনির্মল বাতাস অথবা বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে পারে। তা ছাড়া আলোর ব্যবহার এমনভাবে করা হয়েছে যেন সূর্যের আলোতেই আলোকিত থাকে পুরোটা জায়গা। কৃত্রিম আলোর ব্যবহার এখানে নেই বললেই চলে। রাতে চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোর পরিবর্তে তাই খয়েরি ঠোঙার ভেতর মোমের আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়।”

টেকনাফর হিমছড়ি জাতীয় পার্কের কাছে অবস্থিত ‘মারমেইড ইকো রিসোর্ট’ বাংলাদেশের ব্যক্তিগত খাতে নির্মিত ইকো রিসোর্টের মধ্যে অন্যতম নাম। রিসোর্টটির পাশেই স্থানীয় মন্দির, মাছের বাজার এবং অন্যান্য দেশীয় কৃষ্টির নিদর্শন পাওয়া যায়। নেই জমকালো ভাব। আছে নিরিবিলি ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। আছে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত বাছাইকৃত কর্মী, যাদের আন্তরিক ব্যবহার মুগ্ধ করবে সবাইকে। সেখানে বেড়াতে আসা এক পরিবারের মুখ থেকে শোনা যাক এ রিসোর্ট সম্পর্কে- “আমরা এই ইকো রিসোর্টে অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে একটি আলাদা ভিলায় তিন রাত ছিলাম। আজ আমরা ফিরে যাচ্ছি। নিয়ে যাচ্ছি অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা। নাগরিক যন্ত্রণাময় কংক্রিট শহরে হাত খেকে দু’দণ্ড শান্তির প্রত্যাশায় এখানে আসা। আমার সে আশা পূর্ণ হলো যেন। এখানকার আলাদা রুমগুলো একটু ছোট ছোট। কিন্তু ভিলাগুলোর ভেতরে বেশ অনেকগুলো রুম আছে। ঘরগুলো নানারকম উপাদান দিয়ে বেশ সুন্দর করে সাজানো। সেসব সুন্দর ঘরের খোলা মাটিতে আমরা বিছানা পেতে ঘুমিয়েছিলাম। প্রতিটি ঘরের ছাদ বেশ উঁচু উঁচু। খোলামেলা পরিবেশ কারণে ঘর থেকেই অনাবিল সমুদ্র দেখা যায়। সেই সঙ্গে বয়ে চলে স্নিগ্ধ বাতাস। মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আছে মশারির সুব্যবস্থা। বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে, তবে তা শুধু সন্ধ্যার পর ব্যবহার করা হয়। এখানে খাবারের মান বেশ ভালো, দামেও সাশ্রয়ী। রয়েছে রিসোর্টের নিজস্ব অপূর্ব সুন্দর সৈকত। সবশেষে বলতে হয়, রিসোর্টটিতে কেমন যেন এক ভালোলাগা ভাব ছড়িয়ে আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব নয়, কেবল অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তা অনুভব করা যায়।”


Share with :

Facebook Twitter